মুখে বা নিশ্বাসের দুর্গন্ধ বা হ্যালিটোসিস একটি বিব্রতকর
সমস্যা। এ থেকে রেহাই
পাওয়ার জন্য কী কী করতে হবে, জেনে নিন:
১. বাজারে অনেক ধরনের মাউথ ওয়াশ পাওয়া যায়। তবে অ্যালকোহলযুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার
করা উচিত নয়। এটা
মুখগহ্বরকে শুষ্ক করে তোলে এবং এতে ব্যাকটেরিয়া বেশি
জন্মায়। বরং
প্রাকৃতিক মাউথওয়াশ হালকা গরম লবণ মেশানো পানি দিয়ে কুলিকুচি
করতে পারেন।
২.
সজীব নিশ্বাসের জন্য দাঁত ব্রাশ করার সময় টুথব্রাশে যোগ করা যেতে পারে কয়েক ফোঁটা
চা পাতার তেল অথবা পুদিনার তেল।
৩. যাঁরা মুখের দুর্গন্ধে ভুগছেন, প্রতিবার
খাওয়ার পর ভালোভাবে কুলকুচি করুন। তাহলে মুখের ভেতরে জমে থাকা খাবারের
কণাগুলো বেরিয়ে যাবে।
৪.
বেশির ভাগ মানুষ শুধু তাঁদের দাঁত পরিষ্কার করেন, কিন্তু জিব
পরিষ্কার করেন না। কিন্তু সেটাও
জরুরি।
৫. যাঁদের মুখগহ্বর বেশি শুষ্ক, তাঁরা মুখের
দুর্গন্ধের সমস্যায় বেশি ভোগেন। এ ক্ষেত্রে অল্প অল্প করে বারবার প্রচুর পানি পান করতে হবে।
৬.
ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহলও মুখের শুষ্কতার জন্য দায়ী।
৭. নিকোটিন হচ্ছে সবচেয়ে বড় শত্রু। এটি দাঁত ও জিহ্বাতে জমে যায়। ধূমপান মুখের
ভেতরটাকে বেশি শুষ্ক করে তোলে। এতে
পর্যাপ্ত পরিমাণে লালাও তৈরি হতে পারে না।
ওরাল থ্রাশ
ক্যানডিডা ইস্টের কারণে ওরাল থ্রাশের সৃষ্টি হয়ে থাকে। কিন্তু দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা রোগে
কর্টিকোস্টেরয়েড
স্প্রে
নেয়ার কারণে ক্যানডিডা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। জিহ্বার উপরে যে প্যাচের সৃষ্টি হয়ে
থাকে সেগুলো ঘষে উঠাতে যাবেন না। কারণ এতে করে
ওই স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। একজন
ডাক্তার দেখিয়ে সঠিক
রোগ
নির্ণয় করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
মুখের
অভ্যন্তরে
আলসার বা ঘা এর স্থান যদি শুধুমাত্র স্পর্শ করার কারণে রক্তপাত হয় তাহলে এ
ধরনের আলসার ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত। কারণ এটি ম্যালিগন্যান্ট আলসার এর একটি সচরাচর বৈশিষ্ট। এ বিষয়ে সবার সাবধানতা অবলম্বন করতে
হবে এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। আলসারের
মধ্যে দৃশ্যমান
স্থানকেই আলসার ফ্লোর বলা হয়। বেস
বলতে বুঝায় যার উপরে আলসার বা ক্ষতস্থান অবস্থান করছে। যদি
আলসারের বেস শক্ত গোটার মতো হয়ে থাকে বা শক্ত অনুভূত হয়
তবে সেক্ষেত্রে দেরি না করে দ্রুত কার্যকর চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।
ওরাল
থ্রাশ এবং আলসারের চিকিৎসায় আমাদের দেশে প্রায়ই মুখস্ত ওষুধ প্রদান করা
হয়, কিন্তু
উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে কোনো রোগই সহজ থেকে জটিল আকার
ধারণ করতে পারে। জটিল অবস্থায়
চিকিৎসা বিলম্ব হলে অথবা ভুল চিকিৎসা হলে আসল ক্ষতি হয় রোগীর এবং তার আত্মীয় স্বজনের। অতএব, যে কোনো রোগের চিকিৎসা প্রদানের আগে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা প্রদান করা
উচিত।
হাতের কব্জির ব্যথা
কব্জির ব্যথা খুব
সাধারণ একটি সমস্যা। হঠাৎ ইনজুরির
কারণে কব্জিতে বিভিন্ন ধরনের ব্যথা হয়ে থাকে। মচকে
গেলে কিংবা হাড় ভাঙলে কব্জিতে বেশ ব্যথা হয়। তবে
অনেক দীর্ঘমেয়াদি
সমস্যার জন্য কব্জিতে ব্যথা হতে পারে। যেমন-
বারবার কব্জিতে
চাপ, বাত ও কারপাল
টানেল সিনড্রোম। যেহেতু অনেক
কারণে কব্জিতে ব্যথা হতে
পারে, তাই কখনো
কখনো দীর্ঘমেয়াদি কব্জির ব্যথার সঠিক কারণ নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। সঠিক রোগ নির্ণয় করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার ওপর নির্ভর করে আপনার কব্জির
ব্যথার সঠিক চিকিৎসা।
কব্জির
ব্যথার উপসর্গ
কব্জির
ব্যথার উপসর্গ বিভিন্ন
ধরনের
হয়। এটি নির্ভর করে ঠিক কী কারণে ব্যথা
হচ্ছে তার ওপর। যেমন- অস্টিও আর্থ্রাইটিসের
ব্যথা ঠিক ভোঁতা ধরনের দাঁত ব্যথার মতো, অথচ টেনডনের প্রদাহ বা টেনডিনাইটিসের ব্যথা সাধারণত তীক্ষ্ণ ও ধারালো ধরনের।
আপনার
কব্জির ব্যথার স্থানটি নির্ভুলভাবে দেখাতে পারলে ব্যথার কারণ খুঁজে বের করা সহজ
হবে।
কব্জির
ব্যথার কারণ
আপনার
কব্জি বা রিস্টজয়েন্ট হলো
একটি
জটিল সন্ধি, যা
তৈরি হয়েছে কয়েকটি হাড়ের সমন্বয়ে,
যেমন-
রেডিয়াস ও আলনা
হাড়ের নিম্নাংশ এবং আটটি ছোট ছোট কারপাল হাড়। এই কারপাল হাড়গুলো দুই সারিতে সাজানো। লিগামেন্টের
শক্ত ব্যান্ড আপনার কব্জির হাড়গুলোকে একে অন্যের সাথে,
আপনার
রেডিয়াম ও আলনা হাড়ের নি¤œাংশ
এবং আপনার হাতের
হাড়গুলোকে
সংযুক্ত করে। টেনডনগুলো
হাড়ের সাথে মাংসপেশিকে সংযুক্ত করে। আপনার কব্জির
যেকোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যথা হতে পারে এবং আপনার হাত ও কব্জির ব্যবহারের
সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কব্জির
ব্যথার সাধারণ কারণগুলো
ইনজুরি
- হঠাৎ সংঘর্ষ : হাতের ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে পড়ে গেলে আপনার
কব্জিতে খুব বেশি ইনজুরির ঘটনা ঘটে। এ
ক্ষেত্রে কব্জি মচকে যায়,
কব্জিতে
টান পড়ে এবং কব্জির হাড় ভেঙেও যায়।
হাতের
ওপর ভর দিয়ে পড়ে গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কলিস ফ্রাকচার হয়। এ ক্ষেত্রে রেডিয়াসের নিচের অংশ ভেঙে যায়। কব্জি ফুলে যায়।
- বারবার
চাপ
: কব্জি বারবার নাড়াতে হয় এমন যেকোনো কাজে- টেনিস বল খেলা থেকে শুরু করে কিংবা
বেহালা বহন করতে করতে কব্জির সন্ধির চার পাশের টিস্যুতে প্রদাহ হতে পারে
কিংবা হাড় ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ
করে কোনো বিরতি ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কব্জির কাজ করলে। বারবার
চাপের ফলে হাতের কব্জির ব্যথার আরেকটি কারণ হলো ডি কোয়ার ভেইনস ডিজিজ। এ ক্ষেত্রে কব্জির বাইরের দিকে অর্থাৎ রেডিয়াসের ওপর দিয়ে যে
দুটো টেনডন বিন্যস্ত রয়েছে তাদের আবরণীতে প্রদাহ হয়। ব্যথা
বুড়ো
আঙুলের মূলে অনুভূত হয়।
ডি
কোয়ার ভেইনস ডিজিজে কব্জি নাড়াতে খুব ব্যথা হয়,
কাজ
করতে অসুবিধা হয় এবং অনেক সময় কাজের পর ব্যথা বেশ বেড়ে যায়। বুড়ো
আঙুলে চাপ দিলে প্রচণ্ড ব্যথা হয়।
আর্থ্রাইটিস
বা বাতের ব্যথা
- অস্টিও আর্থ্রাইটিস : সাধারণত কব্জিতে অস্টিও আর্থ্রাইটিস খুব কম হয়। কোনো লোকের কব্জিতে আগে ইনজুরি হয়ে
থাকলে পরে অস্টিও আর্থ্রাইটিস হয়। এ
ক্ষেত্রে কার্টিলেজ বা
তরুণাস্থি
ছিঁড়ে যায় বা ক্ষয় হয়। বুড়ো আঙুলের
মূলে ব্যথা হয়।
- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস : এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ
ব্যবস্থা তার
নিজস্ব টিস্যুগুলোকে আক্রমণ করে। কব্জিতে
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস খুব
বেশি
পরিলক্ষিত হয়। যদি একটি
কব্জি আক্রান্ত হয়, তাহলে
সাধারণত অন্য
কব্জিতেও
এটি ঘটে।
অন্যান্য
রোগ ও অবস্থা
- কারপাল টানেল সিনড্রোম
- গ্যাংলিয়ন সিস্ট
- কিয়েনবক্স ডিজিজ
কব্জি
ব্যথার ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো
যে
কারো হাতের কব্জিতে
ব্যথা হতে পারে- তা আপনি অল্প কাজ করুন কিংবা বেশি কাজ করুন না কেন। কিন্তু কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের কারণে এ
ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। যেমন- খেলাধুলা
করা : বিভিন্ন
খেলাধুলায় কব্জিতে ইনজুরি হতে পারে। এর
মধ্যে রয়েছে বোলিং, গলফ, জিমন্যাস্টিক, টেনিস
প্রভৃতি।
বারবার
কাজ করা :
বেশির
ভাগ ক্ষেত্রে হাত ও কব্জির যেকোনো কাজ বারবার করলে কব্জির ব্যথা বেড়ে যেতে
পারে। যেসব মহিলা হাঁড়িপাতিল ধোয়াধুয়ি করেন বা
বুননের কাজ করেন
(যেমন
সোয়েটার বোনা) তাদের কব্জির ব্যথা বেশি হয়। যারা
চুল কাটার কাজ করেন
তাদেরও
কব্জির ব্যথা বেশি হয়।
যারা
কম্পিউটার কিবোর্ডে টাইপ করেন,
কম্পিউটার
মাউস ব্যবহার করেন, হ্যান্ডবল
খেলেন, সেলাই
করেন, আঁকাআঁকি
করেন, লেখালেখি
করেন বা ভাইব্রেটিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন তাদের কব্জির ব্যথা বেড়ে যায়।
রোগ : যদি আপনার ডায়াবেটিস, লিউকেমিয়া, স্কে¬রোডার্মা, লুপাস থাকে
কিংবা থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করে তা হলে আপনার কব্জির
ব্যথা বেড়ে যেতে পারে।
কী
পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাবেন
আপনার
কব্জিতে ব্যথা
হলেই
প্রথমত আপনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন। তিনি
আপনাকে প্রথমে শারীরিক
পরীক্ষা
করবেন। আপনি কব্জির কোথায় চাপ দিলে ব্যথা অনুভব
করেন তা পরীক্ষা
করে
দেখবেন। কোনো ফোলা
আছে কি না তা দেখবেন। চিকিৎসক
আপনার কব্জির
নাড়াচাড়ার
মাত্রাটা দেখবেন। আপনি শক্ত
হাতে ধরতে পারেন কি না দেখবেন। কিছু কিছু
ক্ষেত্রে তিনি আপনাকে কব্জির এক্স-রে, সিটি স্ক্যান,
বোন
স্ক্যান ও এমআরআই
করতে দিতে পারেন। যদি এসব
পরীক্ষায় কোনো সিদ্ধান্ত না আসে তাহলে আপনার চিকিৎসক আপনাকে আর্থ্রােস্কপি ও নার্ভটেস্ট করে দেখতে
পারেন।
কী
চিকিৎসা নেবেন
হাতের
কব্জির ব্যথার
চিকিৎসাপদ্ধতি
নির্ভর করে ইনজুরির ধরন,
স্থান
ও তীব্রতা সর্বোপরি আপনার
বয়স
ও সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর। প্রথমত, আক্রান্ত
হাতের কব্জিকে বিশ্রামে
রাখতে
হবে এবং যদি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণে কব্জিতে ব্যথা হয়ে থাকে তাহলে তার
উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে হবে। ব্যথানাশক
ওষুধ যেমন- আইবুপ্রফেন ও
অ্যাসিটামিনোফেন
কব্জির ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে
শক্তিশালী ব্যথানাশক
ওষুধ দেয়া যেতে পারে। হাড় ভাঙলে
হাড়ের টুকরোগুলো সঠিক বিন্যাসে রাখতে হবে যাতে ঠিকমতো জোড়া লাগে; এ ক্ষেত্রে
কাস্ট বা স্প্লিন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। কব্জিতে
টান লাগলে বা মচকে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত টেনডন বা লিগামেন্ট
যাতে সুরক্ষা পায় সে জন্য স্প্লিন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
আক্রান্ত
হাতের কব্জিকে নড়াচড়া থেকে রক্ষা করার জন্য রিস্টব্যান্ড ব্যবহার করা যেতে
পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন
হয়। যেমন- মারাত্মকভাবে
হাড় ভাঙলে, কারপাল
টানেল সিনড্রোমের উপসর্গ তীব্র হলে এবং টেনডন বা লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে।
একটি
কথা মনে রাখা প্রয়োজন,
সব
ধরনের কব্জির
ব্যথায় কিন্তু মেডিক্যাল চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। কব্জিতে সামান্য আঘাত পেলে আপনি আঘাতের স্থানে বরফের সেঁক দিলে দারুণ উপকার
পাবেন এবং আক্রান্ত
কব্জিতে ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ পরে থাকবেন।
হাতের
কব্জির ব্যথা কিভাবে প্রতিরোধ করবেন
হাতের
কব্জিতে ব্যথা ঘটায় এমন কোনো কোনো বিষয় প্রতিহত করা বেশ মুশকিল, তবে কিছু
সুরক্ষার জন্য কিছু টিপস মেনে চললে উপকার পাবেন।
- হাড় শক্ত করে গড়ে তুলুন
- পড়ে যাওয়া ঠেকান
- খেলাধুলা করার জন্য সুরক্ষাকর ব্যবস্থা নিন
- পেশাগত
ব্যাপারে
সতর্ক হোন : যারা দীর্ঘ সময় কিবোর্ডে কাজ করেন তারা নিয়মিত বিশ্রাম
নেবেন। টাইপ করার সময় আপনার কব্জিকে রিল্যাক্স
রাখবেন, নিউট্রাল পজিশনে
রাখবেন। আর্গোনোমিক
কিবোর্ড এবং ফোম বা জেল রিস্ট সাপোর্ট ব্যবহার করুন। বারবার কাপড় মোচড়ানো, হাতপাখা দিয়ে
বাতাস করা কিংবা হাতের কব্জিকে বারবার ঘুরাতে হয় এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকুন।