রাশেদ পারভেজ ॥
ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে পারাটা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। সে সৌভাগ্য রুমির (ছদ্মনাম) ছিলো। প্রথম সন্তান ছেলে হওয়ায় যেন লক্ষ্মী-সরস্বতী বনে যায়। স্বামী প্রবাসে তাই বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে দিয়ে কোন প্রয়োজন সারাতে না পারায় সবকাজ একাই করতে হতো তাকে। বাজার-সদাই থেকে শুরু করে ছেলেকে স্কুলে আনা-নেওয়া সবকিছুই। একা এতোকিছু সামাল দিতে গিয়ে নিঃসঙ্গ জীবন নিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলো মেয়েটি। একদিন বাচ্চাকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে পরিচয় হয় ২১ বছর বয়সী রাজ (ছদ্মনাম) নামের এক ছেলের সাথে। কয়েকদিনের আলাপে হৃদ্যতা থেকে একসময় বন্ধুত্ব হয়। পানসে জীবনে একজন সঙ্গী পেয়ে আপ্লুত রুমি বেশ নির্ভার হয়ে উঠতে থাকে। একসময় ছেলেটার প্ররোচনায় স্মার্টফোন ও ফেসবুকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ব্যস, বদলে গেলো দুজনের গল্প। পারস্পরিক শেয়ারিং ও নির্ভরতা বাড়তে থাকে তাদের। নিয়মিত ফোনালাপ, মাঝেমধ্যে স্কুলে দেখা, এরসাথে চলে ফেসবুক-হোয়াটস অ্যাপে চ্যাটিং আর সুযোগ পেলেই ভিডিও কল। ইতিমধ্যে আনকোরা রুমি কিন্তু স্মার্ট হয়ে উঠেছে। ফেসবুক-হোয়াটস অ্যাপে মগ্ন হয়ে পরিবার কিংবা সামাজিক বন্ধনের চেয়ে তার কাছে ভার্চুয়াল সম্পর্ককে বেশ উপভোগ্য মনে হতে থাকে। বাড়তে থাকে বন্ধুর সংখ্যা, সেই সাথে ঘনিষ্ঠতা। ধীরে ধীরে স্বামী-সংসারের প্রতি উদাসীন হতে থাকে রুমি। দূরদেশে থাকা স্বামীর ভালোবাসা এখন নেকামো মনে হয়। ফেসবুক ফ্লার্টই যেন জীবনের পূর্ণাঙ্গতা। শুরু হয় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সন্দেহ আর অবিশ্বাসের কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। আর এভাবেই বিপথগামী হচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম। রুমি হয়তো ঘর-সংসার ছেড়ে রাজ কিংবা অন্য ফেসবুক বন্ধুদের হাত ধরে পালিয়ে যায়নি তবে সম্পর্কের সমীচীনতা নষ্ট করেছে, ভেঙেছে সঙ্গীর বিশ্বাস। একটা স্মার্টফোন আর একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট মেয়েটির আট বছরের প্রেমময় একটা সম্পর্কের বাঁধনে চিড় ধরিয়েছে। প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহার প্রতিদিন এমন অসংখ্য রুমি-রাজকে আরো অপ্রত্যাশিত, নির্মম ও কলুষিত ঘটনার নায়ক-নায়িকায় পরিণত করছে। যা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য অনিবার্য অশনিসংকেত।
সাম্প্রতিক কিছু কেসস্টাডির আলোকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্মার্টফোন ও ফেসবুকের কারণে মানুষের মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরির পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংস এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা দ্রুতই পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে আলগা করে দিচ্ছে। সম্প্রতি আমেরিকান ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক পিউ রিসার্চ’ এর এক গবেষণায় বলা হয়, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ২৫ শতাংশ মনে করেন, তাদের সঙ্গী-সঙ্গিনী স্মার্টফোনের কারণে বেশ দূরে সরে গেছেন। ফেসবুকসহ অন্যান্য সোশাল মিডিয়ার কারণে দাম্পত্য কলহ, ঈর্ষা, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্ম নিচ্ছে। হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন মানুষের বেডরুমে পর্যন্ত প্রবেশ করেছে। এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালবাসা কমিয়ে দিয়ে মানুষের জীবনকে করে তুলেছে যান্ত্রিক। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি মানুষ এখন এতো বেশি পরিমাণে আসক্ত হয়ে পড়ছে যে, তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটার সময়ও ফেইসবুক ও টুইটার ব্যবহার করছে। ফলে তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার প্রকৃত ভালবাসা উপভোগ করতে পারে না। তাদের কাছে ভার্চুয়ালি পুলকিত হওয়াটাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এজন্য তারা প্রায়শ মানসিক বিষণ্নতায় ভোগে। এমনকি অনেক সময় দাম্পত্য জীবনেরও অবসান ঘটছে।
প্রযুক্তির বিকাশ ব্যক্তিকে স্মার্ট করে তুলছে সত্যি কিন্তু এর অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহার আমাদেরকে জনবিচ্ছিন্ন ও আবেগহীন যান্ত্রিক এক প্রজন্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। অধিকন্তু পরস্পরের মধ্যে আগের মত দেখাসাক্ষাত ও ভাব বিনিময়ের আগ্রহটা হ্রাস পেয়েছে। স্মার্টফোন কিংবা ভার্চুয়াল সম্পর্কের প্রতি নির্ভরতা ও আসক্তি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এতে করে মানসিক দূরত্ব তৈরির সাথে মানুষের বাস্তবিক সম্পর্কগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও পরিচর্যা কমে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ সাজ্জাদ কবীর বলেন, ইদানীং দেখা যাচ্ছে ভার্চুয়াল সম্পর্কের প্রতি তরুণপ্রজন্ম বেশ ঝুঁকে পড়ছে আর বাস্তবিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এর কারণ হতে পারে- সোশ্যাল মিডিয়াতে মানুষের যোগাযোগীয় অ্যাপ্রোচটাও সোশ্যাল হয়ে থাকে তবে সেটা অনেকটাই লৌকিকতা। ফেসবুকে সবাই নিজেকে এতো বেশি আকর্ষণীয় আর ইতিবাচকরূপে উপস্থাপন করে যে বোঝার উপায় থাকে না কে কতটা ভালো আর কতটা মন্দ। আর ভুলের শুরুটা তখনি। প্রলোভনে পড়ে কিংবা প্ররোচিত হয়ে নানা অসংজ্ঞায়িত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সেই যান্ত্রিক সম্পর্কের পেছনে ছুটতে গিয়ে বাস্তবিক সম্পর্ককে পাশ কাটিয়ে চলা এবং আসক্ত হয়ে পড়া দুটোই একসময় তাকে বিচ্ছিন্ন ও অপরাধপ্রবণ করে তোলে। কিন্তু সেজন্য প্রযুক্তি কিংবা স্মার্টফোন-ফেসবুককে দায়ী না করে বরং প্রযুক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা এবং ভার্চুয়াল সম্পর্ক তৈরির সময় সচেতন থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে পরামর্শ দেন এই মনোবিজ্ঞানী। যাতে সেসব সম্পর্ক বাস্তবতায় কোন প্রভাব না ফেলে। তবে মানসিকতায় অটুট এবং একটু সচেতন থাকলেই ভালো সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী হওয়া যায় বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী জীয়াদ আবেদীন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির যথাযথ সুবিধা নিতে আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। ইতিবাচক ব্যবহারের চেয়ে নেতিবাচক দিকের প্রতিই ঝুঁকে পড়ছি। ভার্চুয়াল সম্পর্ককে ভার্চুয়ালি রেখে বাস্তবিক সম্পর্কের পরিচর্যা করি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাস বজায় রাখি তবে আমার মনে হয় না এসব কোন সমস্যা।
সেলফি-সেক্সটিং : স্মার্টনেস নাকি মনোবিকার : হালের সাড়া জাগানিয়া স্মার্টপ্রত্যয় ‘সেলফি’। অর্থাৎ সেলফ পোর্টেট বা আত্মছবি। সেলফি শব্দের সাথে পরিচিত নন কিংবা এখনো সেলফি তোলেননি এমন স্মার্ট মানুষ পাওয়া হয়তো দুষ্করই বটে। সেলফি নেশাটা এতই অনিবার্য যে, স্মার্টফোন হাতে তো সেলফি সাথে। হাঁটতে-চলতে, খেতে কিংবা ঘুমোতে, ক্লাসে কিংবা অনুষ্ঠানে, বিয়ে কিংবা মসজিদে, রিকশায় কিংবা অন্য বাহনে যখন খুশি তখন ঝটপট সেলফি ক্লিক এবং প্রচার করেছেন বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে। যেন অঘোষিত এক প্রতিযোগিতা। কেউ একটা মুহূর্তও মিস করতে চান না। কিন্তু যখন সেই প্রতিযোগিতা অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন তো সেটা ভাবায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অমৃত পাল সিং এবং তাঁর এক সঙ্গীর মৃত্যু ছিলো মর্মন্তুদ। বিমানের ককপিটে বসে স্মার্টফোনে সেলফি তুলতে গিয়ে অমৃত নিজে মরেছেন, বিমানের এক যাত্রীকেও মেরেছেন। আবহাওয়া স্বাভাবিক ছিল, বিমানে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির প্রমাণ মেলেনি। অথচ ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী একটি সেলফি শট এবং পাইলটের স্মার্টফোন। এদিকে গত মৌসুমে পবিত্র হজে গিয়েও সেলফি তোলা থেকে বিরত থাকতে পারেন নি হাজীরা। সেলফি তুলছেন আর ফেসবুকে আপলোড করছেন। হাজীদের এমন কাণ্ড দেখে মক্কার ধর্মীয় নেতারা দারুণ সমালোচনার মুখোমুখি হন। সেলফির এমন হুজুগ রীতিমতো নানামুখী বিড়ম্বনার জন্ম দিচ্ছে। অন্যদিকে সেক্সটিং শব্দটা অপরিচিত মনে হতে পারে। সেক্সটিং মূলত যৌনতা নির্ভর চ্যাটিং অ্যাপ্লিকেশন। সেক্স আর টেক্সটিং (টেক্সট মেসেজ) মিলিয়েই তৈরি হয়েছে শব্দটি। এতে যৌনতা নির্ভর ম্যাসেজের পাশাপাশি নিজেদের অর্ধ বা সম্পূর্ণ নগ্ন ছবিও বিনিময় হয়। ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইট এবং ফেসবুক-হোয়াটস অ্যাপেও চলছে এই যৌনতা বিনিময়। যদিও কয়েক বছর আগে সেক্সটিংয়ের উৎপত্তি কিন্তু এটি বর্তমানে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি কিশোররাও এতে জড়িয়ে পড়ছে। সম্পর্কের গভীরতা ভেদে সেক্সটিংয়ের মাত্রাও ভিন্নতর হয়। ব্যবহারকারীদের অসাবধানতার সুযোগে বিভিন্ন হ্যাকিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে এসব ছবি কিছু অসাধু লোকের হাতেও চলে যাচ্ছে। আর সুযোগ বুঝে এগুলো পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন পর্নো ওয়েবসাইটে।
No comments:
Post a Comment