মুহূর্তেই টাকা পাঠানো ও তোলার সুবিধা দিচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং। ফলে দিন যত গড়াচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের
জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে উঠছে। বাড়ছে
লেনদেনের পরিমাণও। এর মাধ্যমে
এখন দৈনিক গড় লেনদেন হচ্ছে প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ কোটি টাকা। তবে
এ জনপ্রিয়তার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র। এই
প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে তারা হরহামেশাই ঘটাচ্ছে নানা প্রতারণার ঘটনা। ছোট-খাট প্রতারণা থেকে শুরু করে মাদক ও
মানব পাচারের অর্থের লেনদেনও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে
প্রতারণা ঠেকাতে নেয়া উদ্যোগ পুরোপুরি কাজে আসছে না। ফলে প্রতারণার ঘেরাটোপ থেকে বের হতে পারছে না এ খাত।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সুবিধাবঞ্চিতদের
ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং চালুর অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয়
ব্যাংক। ব্যাংকগুলো
বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ সেবা দিচ্ছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু
করলেও এখন সবচেয়ে এগিয়ে আছে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। বর্তমানে ১৮টি ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং
সেবা থাকলেও মোট লেনদেনের ৫৫ দশমিক ১১ শতাংশ হয় বিকাশের মাধ্যমে। আর ডাচ-বাংলার ৩৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং
অন্যান্য ব্যাংকের সর্বমোট ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ মার্কেট শেয়ার রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিকাশ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদীর
বলেন, সাধারণ
মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের
কারণে
মোবাইল ব্যাংকিং এর গ্রাহক সংখ্যা ও লেনদেন যেমন বেড়েছে তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংকের
নীতিমালার ধারাবাহিকতা এবং কঠোর নজরদারির কারণে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের
প্রবৃদ্ধিও একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছে।
এক হিসাবে দেখা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৬শ’-৭শ’
টাকা
থেকে শুরু করে
পাঁচ
হাজার টাকার লেনদেনই বেশি?
সাধারণত
যারা অল্প আয়ের মানুষ এবং যারা ব্যাংকে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার মতো দক্ষ নন, তাদের একটি বড়
অংশ এ ব্যাংকিং সেবার দিকে ঝুঁকছেন?
এতে
একবারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করা যায়? তবে কেউ চাইলে একাধিক এজেন্ট বা অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরো অনেক
বেশি টাকা লেনদেন করতে পারেন?
তবে
এই লেনদেনের তেমন কোনো তথ্য থাকে না? এজেন্টের মাধ্যমে করলে যার কাছে টাকা পাঠান হয়, তার মোবাইল
নম্বর ছাড়া আর কোনো তথ্যই থাকে না। আর
সেটার সুযোগ নিয়েই মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে অবৈধ কাজে টাকা ব্যবহার হচ্ছে। ভুয়া মেসেজের মাধ্যমে এজেন্টরা যেমন
টাকা দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন,
তেমনি
গ্রাহকের টাকাও তুলে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে ভূরি ভূরি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তুলনামূলকভাবে যারা অসচেতন তাদেরকে ভুল বুঝিয়ে প্রতারণার ঘটনা
ঘটছে। মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে অন্যের টাকা
হাতিয়ে নেয়ার জন্য বড় ধরনের সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় রয়েছে। অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দক্ষ কায়দায় তারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার
মানুষের টাকা লুফে নিচ্ছে। তাদের
প্রতারণার শিকার হয়েছেন অবসরে যাওয়া সরকারি চাকরিজীবী, সেনা
কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভাইস চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের সদস্যরা পর্যন্ত ।
আইন-শৃংখলা বাহিনীর কাছে আসা অভিযোগে দেখা গেছে, বিভিন্ন
ধরনের অপরাধে মোবাইল ব্যাংকিং-এর সহায়তা নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে,
নোবেল
লরিয়েটের সঙ্গে ডিনার প্রোগ্রাম,
সুলভমূল্যে
ফ্ল্যাট-প্লট প্রদান ও জিনের বাদশার কথা বলে অর্থ আদায়, অপহরণের পর
মুক্তিপণ আদায়, মানবপাচার, চুরি, হ্যাকিং, ন্যাশনাল
আইডি কার্ড জালিয়াতি,
সিএনজি
ও অটোরিকশা ছিনতাই প্রভৃতি। এ সব
ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৩শ’
টাকা
থেকে সর্বোচ্চ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।
এদিকে অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এক
প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়,
বর্তমানে
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্দেহজনক লেনদেন
আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এ মাধ্যমেই
মানবপাচার থেকে শুরু করে ড্রাগ ব্যবসায়ে অর্থায়ন হচ্ছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপর সরকার কঠোর নজরদারি
আরোপ করতে যাচ্ছে। এর আওতায়
দেশের চারটি উপজেলায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হচ্ছে, তার তথ্য
জরুরি ভিত্তিতে জানতে চাওয়া হয়েছে। এই
উপজেলাগুলো হলো কক্সবাজার সদর,
টেকনাফ, উখিয়া ও
মহেশখালী। শুধু অর্থের
লেনদেনই নয়, কোন্
কোন্ নম্বরে, কার
কাছে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন করা হয়েছে বা হচ্ছে, তা-ও সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ
থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে এ ব্যাপারে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান ইতোমধ্যে মোবাইল
ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে নানা পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন সংবাদ মাধ্যমকে? তিনি বলেছেন, মোবাইল
ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশে বিকশিত হচ্ছে। তাই
একদিনে সব ঠিক হয়ে যাবে না। আমরা
ব্যাংকগুলোকে বলছি প্রতিনিয়ত তদারকি করতে।
নামে-বেনামে অ্যাকাউন্ট: নিয়ম অনুযায়ী শুধু মোবাইল ব্যাংকিং
অ্যাকাউন্ট রয়েছে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ মাধ্যমে লেনদেন করবে। তবে বেশিরভাগ এজেন্ট এ নিয়ম না মেনে
নামে-বেনামে অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা পাঠায়। এর
ফলে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে ঘুষ-দুর্নীতিসহ অবৈধ লেনদেন বাড়ছে। কিছুদিন আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
নির্দেশনার আলোকে এ ধরনের কয়েক লাখ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় বিভিন্ন এজেন্ট। বাতিল করা হয় অনেকের এজেন্টশিপও। পরে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারে
অপরাধমূলক লেনদেনে ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর মধ্যে রয়েছে— গড়মিল তথ্য
দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা যাবে না। এতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের হিসাবের কেওয়াইসি (গ্রাহকের পরিচিতি) ফরমে
দেয়া তথ্যের সঙ্গে মোবাইল সিম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সঙ্গতি থাকতে হবে। এছাড়া ঝুঁকি কমাতে পাঁচ হাজার টাকা বা
তার বেশি অঙ্কের লেনদেনে গ্রাহকের ছবি তুলে সংরক্ষণ করতে হবে। তবে অন্যান্য নির্দেশনা ঠিক থাকলেও গ্রাহকের ছবি তোলার
নির্দেশনা পরবর্তীতে শিথিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এদিকে একই নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মোবাইল
ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের হিসাব খুলতে সংশ্লিষ্ট এজেন্টকে সিম নিবন্ধন বা
পুনঃনিবন্ধনের প্রমাণ কপি জমা দিতে হবে, যা এজেন্ট কর্তৃক সংরক্ষণ করা হবে। তবে সে নির্দেশনাও পুরোপুরি পালন হয়নি। এখন বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে গ্রাহকের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে সিম
পুনঃনিবন্ধন ও নতুন সিম কেনার যে নির্দেশনা বিটিআরসি দিয়েছে তাও এখনো বাস্তবায়ন
হয়নি। ফলে যেসব মোবাইল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে
প্রতারণা হচ্ছে তার প্রায় সবই ভুয়া। সম্প্রতি
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মোবাইল
ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট দিয়ে প্রতারণা হয়, তার ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রে ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার হয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকগুলোকে
জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার দেয়ার কাজ শুরু হয়েছে। যাতে নতুন মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের
পাশাপাশি পুরনো অ্যাকাউন্টগুলোও পুনরায় যাচাই করা যায়। সবগুলো ব্যাংক এ প্রবেশাধিকার পেলে প্রতারণা অনেক কমে আসবে।
নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন)
সৈয়দ মোহাম্মদ মুসা ইত্তেফাককে বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা ২২টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র
ডাটাবেজ ব্যবহারের জন্য চুক্তি করেছি। এর
মধ্যে পাঁচটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ছয়টি মোবাইল অপারেটর রয়েছে। এছাড়া ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটা বড়
অংশ এখনো এর বাইরে রয়েছে। এতে
প্রতারকরা এখনো প্রতারণার সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা এ
বিষয়ে বলেন, ব্যাংকগুলো
অনলাইন ডাটাবেজ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করতে না পারায় এবং অনেক ক্ষেত্রে
মোবাইলের সিম ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের কারণে মিথ্যা পরিচয়ে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট
খোলা সম্ভব হয়। তবে
বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম রেজিস্ট্রেশন কাজ শেষ হলে ভুয়া সিমগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। আর প্রত্যেকটা ব্যাংক জাতীয় পরিচয়পত্রের
ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার পেলে সকল অ্যাকাউন্টই যাচাই করা যাবে। এভাবে ধীরে ধীরে প্রতারণা কমে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের (পিএসডি) সর্বশেষ
তথ্য অনুযায়ী (ডিসেম্বর পর্যন্ত),
দেশে
বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ৩ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। তবে এসব অ্যাকাউন্টের মধ্যে চালু রয়েছে
এক কোটি ৩২ লাখ। ২০১৫ সাল
শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩৭ কোটি টাকা। এক বছর আগে যা ৩৪৯ কোটি টাকা ছিল। এক বছরে লেনদেন বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। এছাড়া সারাদেশে ২০১৫ সাল শেষে
ব্যাংকগুলোর মনোনীত মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট রয়েছে পাঁচ লাখ ৬১ হাজার।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতারণার বিষয়ে ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদরা
বলছেন, কোনো
ব্যবস্থাকেই সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত রাখা কঠিন। তবে প্রতারণার মাত্রা ও পরিমাণ কতটা নিচে রাখা যায় সেটাই বড়
বিষয়। প্রতারক চক্র যাতে মোবাইল ব্যাংকিং
ব্যবহার করে প্রতারণা করতে না পারে সেজন্য ব্যাংকগুলোর নজরদারির পাশাপাশি
এজেন্টদের সচেতন থাকতে হবে বলেও তারা জানান।
www.ittefaq.com.bd

No comments:
Post a Comment